shabdamanas

Literary works of Manas Bhattacharjee

নেতাজীর নির্মম পরিণতি এবং খন্ডিত স্বাধীনতা

Admin

January 26, 2026

Share Article

নেতাজীর নির্মম পরিণতি এবং খন্ডিত স্বাধীনতা
মানস ভট্টাচার্য
যারা একসময় বলেছিলেন— “নেতাজী ভারতে ফিরলে আমি খোলা তলোয়ার হাতে প্রতিরোধ করব”, কিংবা যারা তাঁকে “তোজোর কুকুর” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন—আজকের ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সময়ের স্রোতে তারা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। সেই আসিন্ধু-হিমাচল পর্যন্ত বিস্তৃত, শতবর্ষ প্রাচীন জাতীয় কংগ্রেস দল ও ভারতীয় সংস্কৃতি-বিরোধী মার্ক্সবাদীরা আজ জনমানসের ভালোবাসা ও আস্থার কেন্দ্র থেকে বহু দূরে—অস্পষ্ট মরীচিকার মতো।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস নয়; তা ছিল আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের এক সুদীর্ঘ সংগ্রাম। সেই মহাসংগ্রামের অন্যতম—এবং সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার আগে ও পরে জাতীয় কংগ্রেস, তাদের অনুগত বাম দোসর এবং কিছু বিচ্ছিন্ন শক্তি নেতাজীর বিপ্লবী জাতীয়তাবাদকে কখনও হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি। তাঁদের কাছে স্বাধীনতা মানে ছিল কেবল ক্ষমতার হস্তান্তর—জাতির পূর্ণ মুক্তি নয়।
এই মানসিকতারই চরম প্রকাশ দেখা গিয়েছিল ১৯৩৯ সালে অনুষ্ঠিত ত্রিপুরী কংগ্রেস অধিবেশনে। সেখানে সভাপতি পদে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে গান্ধী নির্মম উক্তি করেছিলেন—
“সীতারামাইয়ার পরাজয়ই আমার পরাজয়।”
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এটলির কূটনীতিকে মেনে নিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব নির্লজ্জভাবে দেশভাগের মাধ্যমে ত্রিখণ্ডিত স্বাধীনতায় সম্মতি জানায়। এর ফলে দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও সেই স্বাধীনতা ছিল খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ—জাতির আত্মার সত্যিকারের মুক্তি অধরাই রয়ে গেল।
নেতাজী কেবল কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গেই নয়, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও মৌলিক মতপার্থক্যে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে অনৈক্য ও বিভেদ নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং স্পষ্ট ঘোষণা করেন—ভারতের শ্রমিক আন্দোলন কোনও বিদেশি শক্তি বা মস্কোর নির্দেশে পরিচালিত হতে পারে না। তাঁর মতে, ভারতে একটি সুস্থ ও শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশে কমিউনিস্টরাই সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন—
“The Moscow Communists are a serious menace to the growth of healthy trade unionism in India….”
এই আদর্শগত বিরোধিতা পরবর্তী সময়েও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কমিউনিস্ট পার্টি নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তিসংগ্রামের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। আজ ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে সেই অবস্থানকে হালকাভাবে এড়িয়ে যাওয়া বা স্বভাবসুলভ ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়ে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা যেমন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে, তেমনই সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী আন্দোলনের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে—এটাই ঐতিহাসিক সত্য।
১৯৪১ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৪৫ সালের কোনও এক সময়পর্বে আন্তর্জাতিক স্তরে এক গভীর ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছিল—উদ্দেশ্য একটাই: নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। কারণ, নেতাজী এমন এক নেতা ছিলেন যিনি জন্মগতভাবেই অপ্রতিহত ও অদম্য; যাঁর সাহস, দূরদৃষ্টি ও বিপ্লবী কৌশল উপনিবেশবাদী শক্তিগুলিকে একযোগে আতঙ্কিত করে তুলেছিল।
সেই থেকে আজ অবধি, সমগ্র বিশ্বে যাঁরা প্রকৃত অর্থে বিশ্বনেতার মর্যাদা পেয়েছেন—আব্রাহাম লিংকন, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, ভ্লাদিমির লেনিন, হো চি মিন, নেলসন ম্যান্ডেলা—নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁদেরই একজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ অধ্যায়ে, যখন বিশ্বের শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি নিজেদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত, সেই জটিল আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই নেতাজী ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্ভীক কণ্ঠে ভারতের স্বাধীনতার দাবি, আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন, প্রবাসী ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ করা এবং— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”— এই বজ্রকণ্ঠ আহ্বান তাঁকে কেবল একজন জাতীয় নেতা নয়, এক আন্তর্জাতিক বিপ্লবী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।
নেতাজী গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ভারতচেতনা ও আধ্যাত্মিক ঐক্যের দর্শনে। ‘ভারতের মুক্তি সংগ্রাম’ গ্রন্থে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন—ভারতের জাতিগত ঐক্যের মূল ভিত্তি হিন্দুধর্ম, যা হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
তিনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের মানসপুত্র, শ্রীঅরবিন্দের ভাবশিষ্য, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ‘খোকা ভগবান’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেশনায়ক’ এবং আপামর ভারতবাসীর প্রিয় ‘নেতাজী’—স্বাধীনতা সংগ্রামের দুর্জয় সর্বাধিনায়ক।
নেতাজীর এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, আপসহীন দেশপ্রেম ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান-ই তাঁকে অনেকের কাছে অস্বস্তিকর করে তুলেছিল। তাই তাঁকে ইতিহাসের গতিপথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বারবার, অবশেষে তারা সফলও হয়েছে।
সাতের দশকে ব্রিটিশ সরকার প্রকাশিত Transfer of Power সংক্রান্ত ঐতিহাসিক নথিপত্রের ষষ্ঠ খণ্ডে তৎকালীন ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব আর. এফ. মুডি-র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন প্রতিবেদন রয়েছে। ১৯৪৫ সালের ২৩ আগস্ট তারিখে লেখা ওই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়— ব্রিটিশ সরকার যেকোনো মূল্যে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বিচারপর্ব গোপনে ভারতের বাইরে সম্পন্ন করে তাঁকে প্রাণদণ্ড, নয়তো নির্বাসনে পাঠিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে সরিয়ে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বহুল প্রচলিত সেই ধারণা— যা অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল— যে ১৮ আগস্ট এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু হয়েছে, তার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ২৩ আগস্ট ব্রিটিশ সরকারের তরফে নেতাজী সম্পর্কে ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নিজেরাই বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুর কাহিনিতে বিশ্বাস করেননি। এটি যে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও পরিকল্পনামাফিক শক্তিশালী ছড়ানো রটনা ছিল, মুডি-র এই গোপন প্রতিবেদন তা স্পষ্ট করে।
প্রতিবেদনটি লেখার সময় ভারত সরকারও ভালোভাবেই জানতেন যে নেতাজীর মৃত্যু হয়নি; তিনি বন্দী অবস্থায় কোনো একটি দেশে রয়েছেন এবং তিনি সোভিয়েত রাশিয়ায় যেতে পারেননি। প্রশ্ন থেকেই যায়— সেই দেশটি কোনটি?
নেতাজী গবেষক ও প্রবুদ্ধ পাঠকরা ভালো করেই জানেন যে, জাপানের সক্রিয় সহায়তায় নেতাজী ভারতের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন। সেই জাপানই ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট পারমাণবিক বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকারের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাবে সম্মত হয়। আত্মসমর্পণের শর্ত অনুযায়ী, জাপানকে যেসব ব্যক্তিদের ব্রিটিশের হাতে তুলে দিতে বলা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।
এই প্রেক্ষাপটেই নেতাজীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আবিদ হাসানের সেই সুস্পষ্ট মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে—
“তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু— এক বাজে গল্প।”
এই বক্তব্য এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র মিলিয়ে দেখলে, নেতাজীর অন্তর্ধান ও তথাকথিত মৃত্যু-কাহিনি নিয়ে আজও নতুন করে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
কিন্তু ষড়যন্ত্র যত গভীরই হোক, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আজও ভারতীয় জাতিসত্তার চেতনায় চৈত্যপুরুষ—অমর, অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের এক চিরন্তন প্রতীক।
_____________
________________

— Written by Manas Bhattacharjee

Written by Admin

View all posts →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *