shabdamanas

Literary works of Manas Bhattacharjee

বন্দেমাতরম্: ধর্ম নয়, জাতীয় চেতনার মহামন্ত্র

Admin

January 12, 2026

Share Article

বন্দেমাতরম্: ধর্ম নয়, জাতীয় চেতনার মহামন্ত্র

মানস ভট্টাচার্য

ভারত কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ পাহাড়-পর্বত, নদীনালা আর বন-জঙ্গল বেষ্টিত একটি মৃত্তিকা-খণ্ড নয়। ভারত আমাদের মা—এক জীবন্ত চেতনা। শাশ্বত সনাতন-হিন্দু সাংস্কৃতিক জীবনপ্রবাহে হাজার হাজার বছরের ত্যাগ-তপস্যার ঐতিহ্যে গড়ে উঠা এক স্পন্দিত আত্মসত্তা।

নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা, অত্যাধুনিক টেকনোলজি, অর্থনৈতিক প্রগতির দ্রুত বিকাশশীল ভারত আজ বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ভারত চোখে চোখ রেখে কথা বলতে জানে। যেমন শাস্ত্র বুঝে তেমনি অস্ত্রও বুঝে। সেদিন আর দূরে নয় যখন ভারত আবার স্বমহিমায় বিশ্বগুরুর আসনে অধিষ্ঠিতা হবে।

পরাধীন ভারতমাতার শৃঙ্খল মোছনে স্বাধীনতার যুদ্ধে যে মহামন্ত্র সঞ্জীবনী শক্তি সঞ্চার করেছিল– যে মন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন ক্ষুদিরাম, কানাইলাল, বিনয়-বাদল-দীনেশ, মাস্টারদা সূর্যসেনসহ অসংখ্য বিপ্লবী—যে মন্ত্রে সমগ্র দেশ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে একটানা নব্বুই বছর লড়েছিল, জাতিকে দিয়েছিল আত্মমর্যাদা ও দেশাত্মবোধের অগ্নিশিখা—সেই “বন্দেমাতরম্” মন্ত্র আজও ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তিশালী প্রতীক এবং এক ঐতিহাসিক স্মারক।

ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস আনন্দমঠ (প্রকাশ: ১৮৮২)-এ দেশপ্রেম, ত্যাগ ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ভাবনায় নির্মিত হয়েছে “বন্দেমাতরম”। ইতিহাস, পুরাণ ও প্রতীকচিন্তার মাধ্যমে এখানে “মা” একদিকে শক্তিরূপা দেবী—সংগ্রাম ও আত্মরক্ষার প্রেরণা; অন্যদিকে স্বয়ং মাতৃভূমি ভারতবর্ষ। এই শক্তিচেতনার ধারা আজও ভারতের নারীশক্তির আত্মপ্রত্যয়ে প্রতিফলিত হয়—যখন রাফাল যুদ্ধবিমানের চালক অফিসার শিবাঙ্গী সিং কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল সোফিয়া কুরেশীর মতো সাহসী নারীদের দেখি।

মায়ের তিনটি রূপ—অন্ধকার, দুঃখভারাক্রান্ত ও জ্যোতির্ময়তা অর্থাৎ দেশের পতন, সহিষ্ণু সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ জাগরণের গভীর ইঙ্গিত। “ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী” পংক্তিটি মোটেই ধর্মীয় চিত্রকল্প নয়; এটি শক্তি, আত্মরক্ষা ও জাতীয় চেতনা জাগরণের প্রতীক। বিখ্যাত গান “বন্দে মাতরম্” এই ভাবনাকেই প্রকাশ করে—দেশ পবিত্র ও স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন। উপন্যাসের ত্যাগী ও সংগ্রামী ভাব পরে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনকে প্রভাবিত করে। একে সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তার সঠিক তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়।

প্রকাশের পর আনন্দমঠ দারুণ আলোড়ন তোলে। ব্রিটিশ সরকার সন্দেহের চোখে দেখে এবং কিছু সময়ের জন্য এটি নিষিদ্ধ করেছিল। তা সত্বেও এটি ভারতীয় সাহিত্য ও জাতীয় চেতনার উন্মেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কালজয়ী গ্রন্থ হিসেবে আজও টিকে আছে।

এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত The Economic Times-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ‘এটি শুধুমাত্র একটি সংগীত নয়, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি পুনর্স্থাপন’।

সেই গৌরবোজ্জ্বল বন্দেমাতরম গীতটির ১৫০ বছরের পূর্তির বছরকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে ধরে রাখতে কেন্দ্র সরকার এক মহৎ প্রয়াস নিয়েছেন। কিন্তু এই মহান উদ্যোগে কতিপয় রাজনৈতিক নেতৃবর্গ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অভিযোগ এনেছেন।

অভিযোগ তারাই এনেছে– যারা ভারতের শাশ্বত সনাতন-হিন্দু পরিচয় মানতে চায় না, ভারতের Nationalism এবং হিন্দুত্ব সমার্থক— এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেনা। যারা ভারতকে ‘মা’ বলতে বিরোধিতা করে ; ভারতের আদি সনাতন কৃষ্টি ঐতিহ্যকে স্বীকার করতে চায় না। যারা ‘ত্বং হি দুর্গা দশ প্রহরণ ধারিণী…” কে রিলিজিওন-র মোড়কে ক্ষুদ্র পরিসরে বিচার করে, অতলান্তিক সনাতন-আদর্শ সম্বন্ধে যাদের জ্ঞান অতি সীমিত, যারা আজও মহম্মদ আলি জিন্নাহ-এর মতো বন্দেমাতরমের মধ্যে হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পায়। মাতৃভূমির অঙ্গচ্ছেদন করে পাকিস্তান সৃষ্টি করতে যাদের পূূর্বসূরীদের হৃদয় একটিবারও কেঁপে উঠেনি এবং যারা ভারতের বীর সৈনিকদের কথা বিশ্বাস না করে কিছু বিচ্ছিন্নবাদী মনোভাব সম্পন্ন পরতন্ত্রজীবিদের কথা বিশ্বাস করে সেই সব মেকি-সেক্যুলারবাদীরাই বন্দেমাতরম-এর বিরোধী। এরা সংখ্যায় নগণ্য হলেও এটা ভাববার বিষয়।

বন্দেমাতরমের বিরোধিতা করে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন– Asaduddin Owaisi এবং কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া। Deccan Chronicle-এর সূত্র মতে ওয়েইসি, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বলেছেন যে, তিনি বন্দেমাতরম-কে বাধ্যতামূলক করতে দেবেন না, তাঁর কথায়— “You can jail me, but I won’t say it if it goes against my faith.”

এরপরে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ —একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বন্দেমাতরমকে দেশভক্তির পরীক্ষার মানদণ্ড বানিয়ে তোলার বিপক্ষে বলেছেন। নাগাল্যান্ডের একটি ছাত্র সংস্থাও বন্দেমাতরম সঙ্গীতের বিরোধিতা করেছে।
এসব বিরোধিতা সত্ত্বেও গত ২৮ জানুয়ারি তারিখে — কেন্দ্রীয় সরকারের Home Ministry (MHA) একটি ১০-পাতার নির্দেশ জারি করে বলছে– বন্দে মাতরম-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক সরকারি অনুষ্ঠানে বাজানো বা গাওয়া হবে। এই ‘নতুন নিয়ম’ মূলত ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে কার্যকর হয়েছে ।

কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাহসী, সময়োচিত এবং দৃঢ় পদক্ষেপ। একটি গৌরবময় অধ্যায়কে প্রকৃত অর্থে না বুঝে, ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মের রং লাগিয়ে—বিশেষ করে ইসলামকে জুড়ে দিয়ে—যে ‘গেল গেল’ রব তোলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার দিন শেষ। এই দেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন, বোদ্ধা ও প্রাজ্ঞ; তারা আবেগ নয়, সত্যকে যাচাই করে গ্রহণ করতে জানে।

তাছাড়া ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ সম্পর্কে সঠিক ধারণার প্রয়োজন। ধর্ম বলতে ‘religion’-কে বোঝায় না। ধর্ম সম্পর্কে Annie Besant-এর অত্যন্ত সুন্দর উক্তি রয়েছে। তিনি বলেছেন:

“…It is difficult to translate the word Dharma. It briefly means a code of duty towards God and His people, duty to society, to animals and birds, and love for all creation.”

আচরণবিধি, কর্তব্যবোধ, নৈতিক দর্শন—একটি সভ্যতার জীবনদর্শন—সবকিছুই ধর্ম।

আজকের নতুন ভারত আত্মনির্ভর এবং আত্মবিশ্বাসে দীপ্ত—নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড়কে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছে। এই অগ্রযাত্রার ভিত গড়ে উঠেছে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মতো প্রাচীন আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের উপর, যা ভারতের জাতীয় চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

এই সাংস্কৃতিক জীবনদর্শনের প্রেরণায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় “বন্দেমাতরম্” শব্দবন্ধটি রচনা করেন এবং পরবর্তীতে তা তাঁর উপন্যাস আনন্দমঠ-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। যদিও ভারতীয় দর্শনে মাতৃভূমি
দেবীজননী– এই ধারণা বহুকাল আগের, কিন্তু বন্দেমাতরম শব্দটি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম সৃষ্টি। অথর্ববেদ-এ রয়েছে— “माता भूमिः पुत्रोऽहं पृथिव्याः” (মাতা ভূমিঃ পুত্রোऽহং পৃথিব্যাঃ) অর্থাৎ The Earth is my Mother, I am her child.

১৮৯৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “বন্দেমাতরম্” গানটি পরিবেশন করেছিলেন এবং তা ক্রমে স্বাধীনতা আন্দোলনের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়।

নিঃসন্দেহে “বন্দেমাতরম্” কেবল একটি গান নয়—এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক আবেগময়, অনুপ্রেরণামূলক ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। তাই, সব সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে, এই মহামন্ত্রকে সাদরে গ্রহণ করে ভারতের অগ্রযাত্রায় সামিল হওয়ার পরম সৌভাগ্য যারা অর্জন করেছেন– আগামী ইতিহাসে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
________________

আজকের যুগশঙ্খ পত্রিকায় নিবন্ধটি বেরিরেছে। উৎসাহী বন্ধুদের শেয়ার করলাম।

— Written by Manas Bhattacharjee

Written by Admin

View all posts →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *